Image description

গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে গাজীপুরে যৌথ অভিযানে তাহরিমা জান্নাত সুরভী নামে এক তরুণীকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার গ্রেফতারের ঘটনা নিয়ে বিগত কয়েকদিন ধরে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার পর ৫ জানুয়ারি আদালত তাকে জামিন দিলে তিনি মুক্ত হোন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকায় সুরভীকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে অনেকে চেনেন।

সুরভীকে গ্রেফতারের খবরটি দেশের শীর্ষ স্থানীয় মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয় এবং বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম ওইদিন জানায় যে, সুরভীর একটি চাঁদাবাজ চক্র আছে এবং “চক্রটি ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে”।

পরবর্তী সময়ে যখন সুরভীকে যে মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে সেটির এজাহার সামনে আসে তখন দেখা যায়, তাতে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির কোন অভিযোগ সুরভী বা তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নেই।

এজাহারে কী বলা হয়েছে

তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে গ্রেফতার করা হয় গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় গত ২৬ নভেম্বর দায়ের করা একটি মামলায়। মামলাটি করেছেন সুরভীর পরিচিত সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়, যিনি ঢাকার একটি সংবাদমাধ্যমে মোজো রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।

নাইমুর রহমান দুর্জয়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন “সংবাদ সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার কথা বলে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাইমুর রহমান দুর্জয়কে গাজীপুরের চান্দরা চৌরাস্তা এলাকায় ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে তাকে মারধর করে আটকে রাখা হয় এবং তার মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।”

এজাহারে আরও উল্লেখ আছে, মৃত্যুর হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৪৪,৭০০ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এছাড়া তাকে জোরপূর্বক ইয়াবা ব্যবসার স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বিষয়টি প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

নাইমুর রহমান দুর্জয় দ্য ডিসেন্ট-কেও বলেছেন, তিনি ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ করেননি; সুরভীর বিরুদ্ধে তার সকল অভিযোগ তার মামলার এজাহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

পুলিশও ৫০ কোটির তথ্যের সূত্র জানে না

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, তারা তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করেননি। নাইমুর রহমান দুর্জয় করা মামলায় তার বিরুদ্ধে ৪৪,৭০০ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির কথা বলা আছে। কিন্তু এই টাকা তারা আদায় করতে পারেনি।

“৫০ কোটি টাকার তথ্য মিডিয়া কোথা থেকে পেল তা আমরা জানি না। পুলিশ এ ধরনের কোনো তথ্য দেয়নি। আমরা তাকে শুধু দুর্জয়ের করা মামলায় গ্রেফতার করেছি”, বলেছে ওসি নাসির উদ্দিন।

সুরভীর বিরুদ্ধে অন্য কোন মামলায় ৫০ কোটি টাকা চাাঁবাজির অভিযোগ আছে কিনা– প্রশ্ন করা হলে ওসি জানান, অন্য কোন মামলার তথ্য তার কাছে নেই।

৫০ কোটি টাকার খবরটি যেভাবে এসেছে: একটি টাইমলাইন

দ্য ডিসেন্ট অনুসন্ধান করে দেখার চেষ্টা করেছে কীভাবে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশের শীর্ষ স্থানীয় বহু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলো। এজন্য প্রথমে অনলাইনে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দ্য ডিসেন্ট আলোচ্য সংবাদটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার একটি টাইমলাইন তৈরি করেছে। পরবর্তীতে বেশ কিছু সংবাদামাধ্যম তাদের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ঘোষণা ছাড়া সংশোধন এবং সরিয়ে ফেলায় কিছু প্রতিবেদন এই টাইমলাইন থেকে বাদ পড়েও থাকতে পারে।

সুরভীকে গ্রেফতার করা হয় ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে। অনলাইনে খুঁজে গ্রেফতার সংক্রান্ত প্রথম সংবাদটি পাওয়া গেছে বাংলাদেশ বুলেটিন নামের একটি ওয়েবসাইটে। ওই রাতে ভোর ৩টা ৫৪ মিনিটে (২৫ ডিসেম্বর) “আলোচিত সেই জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা গ্রেফতার” শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বাংলাদেশ বুলেটিন। রিপোর্টার হিসেবে 'টঙ্গী প্রতিনিধি' লেখা রয়েছে।

প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, "ব্ল্যাকমেইল, মামলা বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আজ রাতে গাজীপুরের টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে তাহরিমাকে গ্রেফতার করা হয়।"

এরপর আরও লেখা হয়েছে, "সম্প্রতি গুলশানের এক ব্যবসায়ীর কাছে জুলাই আন্দোলনের মামলার ভয় দেখিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। এই চক্রের মূল নেতৃত্বে ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ভাইরাল জুলাইযোদ্ধা  তাহরিমা। তদন্তে আরও জানা গেছে, এই চক্রটি ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।"

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এই প্রতিবেদনে সুরভীকে গ্রেফতারের তথ্য এবং একাধিক ছবি ব্যবহার করা হলেও এসব তথ্যের কোন সূত্র উল্লেখ করা হয়নি।

পুরো প্রতিবেদনে 'সূত্র' বলতে তিনবার নামহীন সুত্রের কথা লেখা হয়েছে। সেগুলো হলো: "তদন্তে আরও জানা গেছে", "অভিযোগ সূত্রে জানা যায়" এবং "অভিযোগ রয়েছে"।

যেসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে থেকে সুরভী এবং তার চক্র 'টাকা হাতিয়েছেন' তাদেরও কোন নাম পরিচয়ও উল্লেখ করা হয়নি।

এরপর এই খবরের দ্বিতীয় প্রকাশকারী হিসেবে পাওয়া গেছে বাংলাদেশ টাইমস নামে একটি অনলাইন পোর্টালকে। তারা ভোর ৫টা ৪৮ মিনিটে 'মোজো ডেস্ক' উল্লেখ করে হুবহু শিরোনামসহ বাংলাদেশ বুলেটিন এর রিপোর্টটি প্রকাশ করে।

একই প্রতিবেদনের তৃতীয় প্রকাশকারী হিসেবে পাওয়া গেছে অনলাইন পোর্টাল বার্তা বাজার’কে। এই পোর্টালটি সকাল ৭টায় “৫০ কোটি টাকার মামলাবাণিজ্য ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ, গ্রেফতার আলোচিত জুলাইযোদ্ধা সুরভী” শিরোনামে 'ডেস্ক রিপোর্ট' উল্লেখ করে হবহু ওই রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে।

এর প্রায় দেড় ঘন্টা পরে, সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘অনলাইন ডেস্ক’ “৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে কথিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভী গ্রেফতার” শিরোনামে বাংলাদেশ বুলেটিনের ওই প্রতিবেদনটি প্রায় হুবহু প্রকাশ করা হয়। তবে কয়েক জায়গায় বাক্য কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্য ডিসেন্ট এর সার্চে প্রাপ্ত তথ্য মতে, কালের কণ্ঠ এই প্রতিবেদনের চতুর্থতম প্রকাশকারী।

এই চারটি সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের এই প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট।

প্রথম প্রকাশকারী ৪ সংবাদমাধ্যমের রহস্যজনক সূত্র

বাংলাদেশ বুলেটিন এর ম্যানেজিং এডিটর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বুধবার দুপুর একটায় ফোনে কথা বলেন দ্য ডিসেন্ট এর প্রতিনিধি। তখন জনাব সাখাওয়াত জানান, এই রিপোর্ট সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।

“আমাদের এখানে চারটি মিডিয়া আছে। আমি চারটিরই দায়িত্বে আছি। আমরা রিপোর্টারের ওপর নির্ভর করি। তারা যা পাঠায় সেটাই প্রকাশ করি। আমি রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলব, পরে আপনাকে জানাতে পারব”, বলেন সাখাওয়াত।

কখন জানাবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “রাত আটটার পরে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা রিপোর্টারের সঙ্গে ফোনে কথা বলি না। অফিসে আসলে কথা বলব।”

এরপর বুধবার সন্ধ্যায় আবার ফোন করে সাখাওয়াত হোসেনের কাছে তাদের এই প্রতিবেদনের রিপোর্টার ‘টঙ্গী প্রতিনিধি’র নাম ও যোগাযোগ নম্বর চাওয়া হয়। তখন তিনি জানান, তাদের কোন টঙ্গী প্রতিনিধি নেই।

তাহলে ‘টঙ্গী প্রতিনিধি’র নামে খবরটি প্রকাশ করা হলো কেন, এমন প্রশ্নের জবাব তিনি বলেন, ‘এটা ডেস্ক থেকে কেউ করেছে।’

এরপর তিনি আরও জানান, প্রকৃতপক্ষে খবরটি তারা দৈনিক কালের কণ্ঠ থেকে কপি করেছেন।

যদিও ওয়েবসাইটে প্রদত্ত সময় অনুযায়ী, বাংলাদেশ বুলেটিনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে রাত ৩টা ৫৪ মিনিটে আর কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন তার প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে প্রকাশিত হয়েছে।

নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে জনাব সাখাওয়াত কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেইজে শেয়ার করা এ সংক্রান্ত একটি ফটোকার্ডে স্ক্রিনশট এবং সেটি যে মোবাইলে নেয়া হয়েছে সেটির মেটাডাটার স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন।

দ্য ডিসেন্ট কালের কণ্ঠের ওই ফটোকার্ডটি তাদের ফেসবুক পেইজে খুঁজে পেয়েছে যেটি পোস্ট করা হয়েছে ২৫ ডিসেম্বর ভোর রাত ২টা ১০ মিনিটে। তবে ফটোকার্ডে যে শিরোনাম রয়েছে তাতে সুরভীর গ্রেফতারের তথ্য থাকলেও ‘৫০ কোটি টাকার’ কথা নেই। এবং কালের কণ্ঠের ফটোকার্ডে ‘বিস্তারিত লিংকে’ লেখা থাকলেও কমেন্ট সেকশনে ওয়েবসাইটের কোন লিংক পাওয়া যায়নি। কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটেও ফটোকার্ডে উল্লিখিত শিরোনামের কোন প্রতিবেদনও পাওয়া যায়নি। হতে পারে, এরকম শিরোনামের প্রতিবেদন করে পরে ডিলিট করা হয়েছে। ডিলিট করা হয়ে থাকলে তাতে ‘৫০ কোটি টাকার’ প্রসঙ্গ ছিল কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে কালের কন্ঠের প্রতিবেদন থেকে বাংলাদেশ বুলেটিন কপি করেছে কিনা তাও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

কালের কণ্ঠের অনলাইনে দায়িত্বরত একাধিকজনের সাথে কথা বললে তারা জানান, ওই রাতের শিফটে যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনি এখন আর পত্রিকাটিতে চারকিরত নেই। ফলে, তারা এই শিরোনামের কোন প্রতিবেদন কেন এখন নেই তার ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না।

অনলাইনে থাকা প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বুলেটিন-ই প্রথম ৫০ কোটি প্রসঙ্গ নিয়ে রিপোর্ট করে বলে পাওয়া যাচ্ছে। এবং কালের কণ্ঠ পরবর্তীতে তাদের প্রতিবেদনটিই যে, কপি করে নতুন করে প্রকাশ করেছে সেটিও প্রমাণিত।

৫০ কোটি চাঁদাবাজির খবরটি বাংলাদেশ টাইমস কোথা থেকে পেয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিষ্ঠানটির মোজো এডিটর সাব্বির আহমেদ বলেন “আমার এই নিউজ সম্পর্কে জানা নেই। আপনি যদি আমার কাছে নিউজের লিঙ্ক দিতে পারেন, আমি খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।”

পরবর্তীতে নিউজের লিংক পাঠালে তিনি জানান, তারা তথ্যটি বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকা থেকে নিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশ টাইমস এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বুলেটিন এর ক্রেডিট দেয়া ছিল না।

বার্তা বাজার খবরটি কোথায় পেয়েছে প্রশ্ন করলে পোর্টালটি সম্পাদক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা নিউজটি বাংলাদেশ টাইমস থেকে কপি করেছি। এই ধরনের নিউজগুলো যখন আমরা অন্যদের থেকে সংগ্রহ করি, তখন ডেস্ক রিপোর্ট হিসেবে উল্লেখ করি।”

৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির তথ্য যুক্ত যে প্রতিবেদনটি কালের কণ্ঠ ২৫ তারিখ সকাল ৮টা ২৮মিনিটে প্রকাশ করেছে সেটির সূত্র কী জানতে চাইলে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী বলেন, “আমি এই রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু জানি না। খোঁজ নিতে হবে, তারপর আপনাকে জানাতে পারব।”

এর কিছুক্ষণ পর কালের কণ্ঠের অনলাইনে কর্মরত একজন প্রতিবেদকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, তারা প্রতিবেদনটি বার্তা বাজার থেকে সংগ্রহ করেছেন।

তবে অন্য একটি অনলাইন পোর্টাল থেকে খবর নিয়ে কোন প্রকার যাচাই এবং ক্রেডিট উল্লেখ করা ছাড়াই তা প্রকাশের বিষয়ে জানতে হায়দার আলীর সঙ্গে পরবর্তীতে যোগাযোগ করলে তিনি সাড়া দেননি।

অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে প্রকাশ করেছে এই খবর

কালের কণ্ঠের পরে ৯টা ১০ মিনিটে ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ এর বরাতে “৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভী গ্রেফতার” শিরোনামে খবরটি প্রকাশ করে বাংলা ভিশন। ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ এর বরাত দেয়া হলেও প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ বুলেটিন এর প্রতিবেদনের হুবহু কপি-পেস্ট; শুধু কয়েকটি বাক্য আগ-পিছ করা হয়েছে।

এরপর ৯টা ৩৫ মিনিটে 'গাজীপুর প্রতিনিধি' এর বরাতে খবরটি প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন। “জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভী গ্রেফতার” শিরোনামের ভেতরে ৫০ কোটি চাঁদাবাজির তথ্য বাংলাদেশ বুলেটিনে যেভাবে ছিল সেভাবেই হাজির করা হয়েছে। বাকি প্যারাগুলোও একই রকম। শুধু এখানে একটি সূত্র যুক্ত করা হয়েছে, “টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান” বলে।

বাংলা ট্রিবিউনের গাজীপুর প্রতিনিধি রায়হানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ৫০ কোটির তথ্যটি তাকে জানানি টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান। অন্য কোন সাংবাদিকের কাছ থেকে জেনে তিনি ওসির বরাতে এটি লিখেছিলেন। এখন আর ওই সাংবাদিকের নাম মনে নেই।

২৫ ডিসেম্বর ১০টা ৩ মিনিটে দৈনিক ইত্তেফাক 'ইত্তেফাক ডিজিটাল রিপোর্ট' এর বরাতে খবরটি প্রকাশ করে শিরোনাম দেয়, "৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে আলোচিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভী গ্রেপ্তার"।

১০টা ৫৩ মিনিটে দৈনিক যুগান্তর 'যুগান্তর প্রতিবেদন, গাজীপুর' এর বরাতে শিরোনাম করে “কথিত জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা গ্রেফতার, ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি”।

১০টা ৫৩ মিনিটে দেশ রূপান্তরও ডেস্ক এর বরাতে শিরোনাম করেছে, “৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ, আলোচিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভী গ্রেপ্তার”।

১০টা ৫৪ মিনিটে আরটিভি অনলাইনে 'আরটিভি নিউজ' এর বরাতে "৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ ‘জুলাইযোদ্ধা’ সুরভীর বিরুদ্ধে, আরও যা জানা গেল" শিরোনামে খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে।

বিকাল ৩টা ৬ মিনিটে 'টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি' উল্লেখ করে দৈনিক সমকাল তাদের ওয়েবসাইটে ও পরে মাল্টিমিডিয়া স্টোরি প্রকাশ করে। শিরোনাম ছিল, “৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ কথিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা গ্রেপ্তার।”

যেহেতু 'টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি' দেয়া আছে, তাই সমকালের টঙ্গী প্রতিনিধি মুসার সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, এই তথ্য তাকে কেউ বলেনি। মুসা বলেন, “খালি আমি নই তো। আরও অনেক সংবাদমাধ্যম এই তথ্য প্রকাশ করেছে।”

এছাড়া চ্যানেল আই অনলাইন, ডিবিসি নিউজকালবেলা, জাগো নিউজ সহ আরও বেশ কিছু গণমাধ্যম এই নিউজ প্রকাশ করে। সবার এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনের প্যারাগুলো প্রায় হুবহু মিলে যায়। সূত্রগুলোও সব জায়গায়ই নাম পরিচয়হীন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সমকালের অনলাইন সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি অবগত নই। খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।”

এরপর কল করা হলে তিনি জানান, রিপোর্টটি প্রতিনিধির তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই সংশোধন করা হয়েছে।

এ ছাড়াও বাংলাভিশনের হেড অফ নিউজ আব্দুল হাই সিদ্দিক বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না। অনলাইন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।”

দ্য ডিসেন্ট বাংলাভিশনের অনলাইনে দায়িত্বে থাকা কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। 

যুগান্তরের অনলাইন শিফট ইনচার্জ আতাউর রহমান বলেছেন, খবরটি আমাদের দৃষ্টিতে আসার পর তাতে গরমিল আছে বলে মনে হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সংশোধনী দেব।

ইত্তেফাকের অনলাইন সম্পাদক সহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও পাওয়া যায়নি।

দ্য ডিসেন্ট এই প্রতিবেদক কর্তৃক যোগাযোগের পর বাংলাদেশ বুলেটিন, সমকালসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাদের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদগুলো সরিয়ে নিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংশোধনী নোটিশও দিয়েছেন।

সূত্র: দ্য ডিসেন্ট