Image description

ঢাকার কারওয়ান বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। বিদেশে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছ থেকে আসে হত্যার সংকেত। ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে হত্যা মিশনের দায়িত্ব নেন ওই সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. বিল্লাল। তার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বিল্লালসহ হত্যায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

রোববার (১১ জানুয়ারি) রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে ডিবি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়িক কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। গ্রেপ্তার চারজন প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য দিয়েছে তা নিয়ে কাজ চলছে।

ডিবি জানায়, গ্রেপ্তার চারজন হলেন জিন্নাত, মো. বিল্লাল, আব্দুল কাদির ও মো. রিয়াজ। তাদের মধ্যে বিল্লাল ও আব্দুল কাদির আপন দুই ভাই। তাদের আরেক ভাই পলাতক আব্দুর রহিমও এই হত্যায় জড়িত। তিন ভাইয়ের বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদীর গগুলা গ্রামে। ডিবির ভাষ্য, মুছাব্বির ও সুফিয়ান বেপারি মাসুদকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল জিন্নাত ও রহিম। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি নম্বরহীন মোটরসাইকেল ও ৬ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। মোটরসাইকেলটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার রিয়াজের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলের দ্বিপাশা এলাকায়। গ্রেপ্তার জিন্নাতের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের আটোয়ারির মির্জাপুরে। তবে জড়িত সবাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাস করেন। আগামীকাল সোমবার গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতে হাজির করে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করবে পুলিশ। 

গত বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারের বিপরীতে স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে দুর্বৃত্তরা মুছাব্বিরকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদি হয়ে তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়।

ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্নভাবে তদন্ত করে আমরা মুছাব্বির হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করি। একাধিক টিম ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ এলাকায় তাদের ধরতে অভিযান চালায়। একজন জিন্নাতসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যার আগের দিন আসামিরা ঘটনাস্থল রেকি করেছিল। রেকি করতে সহযোগিতা করেছিলেন রিয়াজ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

আসামিদের রাজনৈতিক কোনো পরিচয় আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তবে আসামিদের কারওয়ান বাজারে ব্যবসা আছে। তাদের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ওঠা-বসা ছিল।
 
তদন্ত সূত্রের দাবি, অনেক বছর ধরেই কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন খাতে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের চাঁদা ওঠে। এই বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক গ্রুপ সক্রিয়। বিভিন্ন সময় স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘাত ও খুনোখুনি হয়েছে। এবারও কারওয়ান বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৃষ্টি বিরোধের কারণে মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুছাব্বিরকে টার্গেট করেছিল একটি গ্রুপ। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামের লোকজনও কারওয়ান বাজারের একটি অংশের নিয়ন্ত্রণে। 

সুইডেন আসলামের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন বিনাশ থাকেন মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকে বিনাশ ১৫ লাখ টাকা চুক্তিতে ঢাকায় বিল্লালকে এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব দেন। মুছাব্বিরকে খুন করতে পারলে যেহেতু ১৫ লাখ টাকা পাওয়া যাবে, তাই বিল্লাল আপন দুই ভাই কাদের ও রহিমকেও কিলিং মিশনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। রাজি হয়ে যান তারা। এছাড়া জিন্নাত, রিয়াজসহ আরও কয়েকজনে নিয়ে খুনের ছক করে। মুছাব্বির প্রায় প্রতিদিন রাতে কারওয়ান বাজারের বিপরীতে পাশে স্টার হোটেলে  দলীয় কর্মী কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, সেটা আগেই জানতেন বিল্লাল। স্টার হোটেলের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলি হয়ে পৈত্রিক বাড়ি যাওয়ার বিষয়টিও তিনি অবগত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন সহযোগী রিয়াজসহ কয়েকজন স্টার হোটেলের সামনে এবং ওই গলি রেকি করেন। পরদিন বুধবার শ্যুটার জিন্নাত ও রহিম আগে থেকেই স্টার হোটেলের পাশের গলির অন্ধকার স্থানে অবস্থান নেন। তাদের সেখানে বিল্লাল মোটরসাইকেল করে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। বিল্লালও ঘটনাস্থলের পাশে প্রধান সড়কে অবস্থান নেন। এ ছাড়া তাদের আরও কয়েকজন সহযোগী আশপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন। রাত সোয়া ৮টার দিকে মুছাব্বির ও কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুদকে গুলি করেন জিন্নাত ও রহিম। পরে তারা প্রধান সড়ক পার হয়ে কারওয়ান বাজারে লোকজনের সঙ্গে মিশে যান।

ডিবিপ্রধান বলেন, অনেকগুলো বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছুদিন আগে মুছাব্বির একটি মানববন্ধন করেছিলেন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। সেখানে মারামারি হয়েছিল, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। তিনি একজন জনপ্রিয় নেতা। রাজনীতির দিক থেকে তিনি ওপরের দিকে উঠছিলেন। এই বিষয়গুলোও আমরা খতিয়ে দেখছি।

মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম-সম্পাদকও ছিলেন একসময়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে গেছেন। গত বুধবার রাত ৮টার কিছু পরে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের হোটেল সুপারস্টারের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে বন্দুকধারীরা মুছাব্বিরকে গুলি করে। তার সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানার ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারি মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন।

ঘটনার পরদিন অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে এদিন তেজগাঁও থানায় মামলা করেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম।