ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের দাবি উঠছে, ঠিক তখনই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন বিতর্কিত কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল বাশার। অভিযোগ উঠেছে, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং সাবেক অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির সঙ্গে বিশেষ ‘চুক্তির’ মাধ্যমে এই পদ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
ঋণ মওকুফ ও পদোন্নতির ‘গোপন ডিলিংস’
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ আবুল বাশার বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের ২ নম্বর ডিএমডি হিসেবে দায়িত্বরত থাকলেও তার মূল লক্ষ্য এখন এমডি পদ। এর বিনিময়ে তিনি এ্যানির শ্বশুরের (অগ্রণী ব্যাংক রমনা শাখা) এবং এ্যানির ভাইয়ের (লক্ষ্মীপুর শাখা) কোটি কোটি টাকার খেলাপি ঋণ মওকুফ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া বৃহত্তর কুমিল্লায় জিএম থাকাকালে জোনায়েদ সাকির ঘনিষ্ঠজনদের লোন মওকুফ করে দিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই সুবিধাভোগী মহলের আস্থা অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আবুল বাশার এমডি হতে সাকি ও এ্যানিকে ৫০ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ডিলিংসের অংশ হিসেবেই প্রতিমন্ত্রী সাকিকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে অন্য দায়িত্বে নেওয়া হয়েছিল বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
আওয়ামী লীগের ‘রাম রাজত্ব’ ও লুটপাট
চাঁদপুরের বাসিন্দা মুহাম্মদ আবুল বাশার সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি এবং মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ আছে, গত ১৫ বছর ধরে তিনি আওয়ামী লীগের আশীবাদপুষ্ট হয়ে অলিখিতভাবে গোটা ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এমনকি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা এমডিকেও তিনি তোয়াক্কা করতেন না। ২০২৩ সালে ২ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রভাব খাটিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ডিএমডি পদ বাগিয়ে নেন তিনি।
প্রশাসনের দায়িত্বে থেকে তিনি বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে মোটা অংকের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। প্রতিটি শাখা ব্যবস্থাপক পদায়নে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা এবং ঋণের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নারী কেলেঙ্কারি ও নৈতিক স্খলন
মুহাম্মদ আবুল বাশারের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র আর্থিক দুর্নীতিই নয়, মাদক সেবন ও নৈতিক স্খলনেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কুমিল্লা সার্কেলে কর্মরত থাকাকালে কুমিল্লা ক্লাব ও বার্ড-এ নারীদের নিয়ে রাত যাপনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। এমনকি ঢাকার নামী হোটেলে নারীসহ অবস্থানের সিসিটিভি ফুটেজও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। অভিযোগ আছে, নারী কর্মীদের অনৈতিক সুবিধা দিতে বাধ্য করার বিনিময়ে তিনি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিতেন।
অঢেল বিত্ত-বৈভব ও বিদেশে বাড়ি
মাত্র ৭০ হাজার টাকা স্কেলের এই কর্মকর্তার জীবনযাপন রূপকথাকেও হার মানায়। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির অর্থে তিনি মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বা বাড়ি করেছেন। এছাড়া রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজস্ব বাড়ি, গ্রামে অঢেল সম্পত্তি এবং সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন তিনি। এর আগেও সদরঘাট শাখায় থাকাকালে এলসি অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটে তার দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছিল।
সংস্কারের দাবি ও চরম ক্ষোভ
৫ আগস্টের পর বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের বদলির নির্দেশ দিলেও ডিএমডি আবুল বাশার সেই নির্দেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বৈরাচারের দোসরদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখছেন। তার এই সিন্ডিকেটে আরও ৩ জন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) রয়েছেন, যারা সবাই ৯৩ ব্যাচের কর্মকর্তা।
অগ্রণী ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট না ভাঙলে এবং মুহাম্মদ আবুল বাশারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে পড়বে। বর্তমানে ব্যাংকের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ এই বিতর্কিত সিন্ডিকেটের হাতে থাকায় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।



